বালৃুরপাড় রিয়েল এস্টেট (ব্লগ)

জমি সংক্রান্ত আইন ও সমস্যর সমাধান এখানেই

মানসিক প্রতিবন্ধীর উত্তরাধিকার

বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের ১ কোটি ২০ লাখই মানসিক প্রতিবন্ধী। প্রায়ই দেখা যায়, পরিবারের মানসিক ভারসাম্যহীন সদস্যটিকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে অন্য সদস্যরা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম ও হিন্দু পারিবারিক আইন এ ব্যাপারে কী বলে? লিখেছেন মারুফ আল্লাম

সেলিম একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। তার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। যত দিন বাবা বেঁচে ছিলেন, সেলিমকে কোনো ধরনের বঞ্চনার শিকার হতে হয়নি। বাবার মৃত্যুর পর তার মা-ও মারা যান খুব কম সময়ের ব্যবধানেই। ফলে সেলিম চরম অসহায় হয়ে পড়েন। সেলিমরা পাঁচ ভাই-বোন। দুই বোন আর তিন ভাই। সেলিম সবার ছোট। বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি যখন বিলিবণ্টন হয়, তখন বড় দুই ভাই সেলিমকে বঞ্চিত করেন। দুই বোন আগে থেকেই জানতেন, তাদের সম্পত্তি দেয়া হবে না। নিজেরা সম্পত্তি না পেলেও তারা চেয়েছিলেন সেলিমকে তার অংশটুকু যেন বুঝিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ‘সেলিম সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা করতে পারবে না’ এই যুক্তিতে বড় দুই ভাই সেলিমের জন্য কোনো বরাদ্দ না রেখেই সম্পত্তি বণ্টন করে ফেলেন। বণ্টনের সময় তারা সেলিমের দেখাশোনার যাবতীয় খরচাদি বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, কদিন অতিক্রান্ত হতেই সেলিমের খোঁজ কেউ নিচ্ছেন না।
আমাদের সমাজে মানসিক প্রতিবন্ধীদের এমন চিত্র কম নয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মোট ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখই কোনো না কোনোভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী। এই বিপুল পরিমাণ মানুষ নানারকমের সামাজিক বঞ্চনার শিকার। উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে তাদের বঞ্চিত করার প্রবণতা আমাদের সমাজে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। যখন কোনো ব্যক্তি সুস্থভাবে তার দৈনন্দিন কার্যকলাপ করতে অপারগ হয় কিংবা যার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তির স্বাভাবিকতা প্রকাশ পায় না, তাকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বা ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’ বলা হয়। পরিবারের কোনো সদস্য মানসিক ভারসাম্যহীন হলে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার মানসিকতা তৈরি হয়। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে এ ধরনের লোকেরা অধিকাংশ সময়ই তাদের প্রাপ্য অংশ পায় না ।
শুরুতে উলি্লখিত ঘটনা থেকে আমাদের মনে বেশকিছু আইনি প্রশ্নের উদয় হয়। মানসিক প্রতিবন্ধীরা কি উত্তরাধিকার সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী? মুসলিম কিংবা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এ সম্পর্কে কী বলে? মানসিক প্রতিবন্ধীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে যদি অংশ থেকেই থাকে, তাহলে তাদের বঞ্চিত করা হলে কী প্রতিকার রয়েছে?
মানসিক প্রতিবন্ধী কি উত্তরাধিকার সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী?
মানসিক প্রতিবন্ধী উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অংশ পাবেন কি না, তা নির্ধারিত হবে ওই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মীয় পারিবারিক আইন অনুসারে। ওই ব্যক্তি যদি মুসলিম হন, তাহলে ইসলামি শরিয়া অনুসারে তাকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে কোনোক্রমেই বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। তবে তিনি যদি হিন্দু হন, সে ক্ষেত্রে তাকে বঞ্চিত করা হতে পারে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো সংস্কার আসেনি, যাতে এ ধরনের মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির উত্তরাধিকার নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।



হিন্দু আইনে মানসিক ভারসাম্যহীনের উত্তরাধিকার
হিন্দু সনাতন উত্তরাধিকার আইনে শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে একজন ব্যক্তি তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। যেমন অন্ধ, বধির, মূক, পুরুষত্বহীন এবং হাবা_ এই ব্যক্তিরা সম্পত্তিতে কোনো অংশ পান না। এসব ব্যক্তি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
উল্লেখ্য, ১৯২৮ সালে ‘উত্তরাধিকার অযোগ্যতা দূরীকরণ আইন’ দ্বারা হিন্দু উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ‘বঞ্চনার নীতিমালা’ বহুলাংশে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ওই আইনের বিধান মতে, মিতাক্ষরা শাসিত অঞ্চলে সহজাত পাগল ও হাবা ছাড়া অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে কাউকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। অর্থাৎ ১৯২৮ সালের আগে হিন্দু আইনে সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলেও ১৯২৮ সালের পর থেকে মিতাক্ষরা শাসিত অঞ্চলে এভাবে বঞ্চিত করা যাবে না। কেবল জন্ম থেকে যারা মানসিক ভারসাম্যহীন তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, ১৯২৮ সালে অবিভক্ত ভারতের জন্য প্রণীত এ আইন বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য তেমন কোনো সুফল দিতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুরা দায়ভাগ মতবাদে বিশ্বাসী। অথচ এ আইন কেবল মিতাক্ষরা শাসিত অঞ্চলে প্রযোজ্য। ফলে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবরকমের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীরা হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি পাওয়ার যোগ্য নন। এ কারণে বাংলাদেশে মানসিক ভারসাম্যহীন অনেক হিন্দু ব্যক্তি তাদের উত্তরাধিকারের অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মিতাক্ষরা অঞ্চলে প্রযোজ্য আইনটি যদি বাংলাদেশে দায়ভাগ মতপন্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা যেত, সে ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে হিন্দুধর্মাবলম্বী প্রতিবন্ধীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে এ আইন বলবৎ করা হলেও জন্মগত প্রতিবন্ধীরা কিন্তু উত্তরাধিকারী হতে পারবেন না। সুতরাং, সব ধরনের প্রতিবন্ধীরা যেন উত্তরাধিকার সম্পত্তি পেতে পারেন, সেজন্য হিন্দু আইনে কোনো সংস্কার আনা যায় কি না, তা চিন্তা করা যেতে পারে।
মুসলিম আইনে মানসিক ভারসাম্যহীনের উত্তরাধিকার
ইসলামি শরিয়া আইনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে যারা বঞ্চিত হবে, তাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা দেয়া আছে। সে হিসেবে কেবল হত্যাকারী, ক্রীতদাস এবং ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদেরই কেবল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হবে। এর বাইরে শারীরিক কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। তবে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেহেতু তার সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করার সক্ষমতা রাখেন না, তাই তার সম্পত্তি তার কল্যাণে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে একজন অভিভাবক নিযুক্ত করতে হবে। সালিশ কিংবা আদালতের মধ্য দিয়ে এই অভিভাবক নিযুক্ত করা যায়।

আপনিকি ঢাকায় প্লট/ফ্ল্যাট/জমি ক্রয়ের কথা ভাবছেন? আপনার পছন্দের প্লট/ফ্ল্যাট/জমিটি আমাদের কাছেই আছে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published.